'তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সারা দেব !' -(সূরা মুমিনঃ ৬০)
দোয়াটির ইতিবৃত্ত ও ফজিলত
কুমাইল ইবনে যিয়াদ নাখাঈ ছিলেন আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ)-এর একজন ঘনিষ্ঠ সহচর। এ অসাধারণ দোয়া প্রথম উচ্চারিত হয়েছিল হযরত আলীর সুমধুর, অথচ যন্ত্রণাকাতর কণ্ঠে। বসরার মসজিদের যে মজলিসে হযরত আলী ১৫ শাবানের রাতের তাৎপর্য সম্পর্কে বক্তব্য রাখছিলেন সে মজলিসে কুমাইল উপস্থিত ছিলেন। হযরত আলী বলেছিলেন, ‘যে ব্যক্তি এ রাত জেগে ইবাদত করবে এবং নবী খিজিরের দোয়া পড়বে নিঃসন্দেহে ঐ ব্যক্তির দোয়া কবুল হবে।’ মজলিস শেষে কুমাইল হযরত আলীর ঘরে এসে তাঁকে হযরত খিজিরের দোয়া শিখিয়ে দিতে অনুরোধ করেন। হযরত আলী কুমাইলকে বসিয়ে দোয়াটি আবৃত্তি করেন এবং সেটা লিখে মুখস্থ করে রাখার নির্দেশ দেন।
হযরত আলী কুমাইলকে পরামর্শ দিলেন প্রতি শুক্রবারের শুরুতে (জুমুআর রাতে) একবার করে কিংবা বছরে অন্তত একবার এ দোয়া পড়তে যাতে মহান আল্লাহ্ শত্রুর অনিষ্ট ও মুনাফিকদের ষড়যন্ত্র হতে তাঁকে রক্ষা করেন। তিনি আরও বলেন, ‘হে কুমাইল! তোমার সাহচর্য ও উপলব্ধির সম্মানে আমি এ দোয়া তোমার হেফাজতে উৎসর্গ করলাম।’
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَانِ الرَّحِيمِ
পরম করুণাময় অনন্ত দাতা আল্লাহ্র নামে শুরু করছি
اللّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَ آلِ مُحَمَّدٍ
হে আল্লাহ্! হযরত মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর বংশধরদের ওপর দরূদ প্রেরণ কর
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْألُكَ بِرَحْمَتِكَ الَّتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيٍْء
হে আল্লাহ্! আমি তোমার কাছে আকুতি জানাই তোমার ‘রহমত’-এর উসিলায় যা সমস্ত কিছুকে পরিব্যাপ্ত করে।
‘আল্লাহ্’ শব্দটি আল্লাহ্ তায়ালার জন্য নির্দিষ্ট এবং অন্য কোন ভাষায় এর কোন প্রতিশব্দ নেই, ইংরেজি ‘God’ শব্দের অর্থ ‘দেবতা’-উপাসনার বস্তু- যা হতে পারে আগুন, মূর্তি, জন্তু, সূর্য বা অন্য কোন গ্রহ বা নক্ষত্র। এর স্ত্রীলিঙ্গ ‘GODDESS’ এবং বহুবচন ‘GODS’। অন্যদিকে ‘আল্লাহ্’ শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ বা বহুবচন নেই এবং এ শব্দ একমাত্র সেই পরম সত্তা ছাড়া আর কোন ব্যক্তি বা বস্তু বোঝাতে কখনো প্রয়োগ করা হয়নি। আরবি শব্দ ‘ইলাহুন’ শব্দকে, যার দ্বিবচন ‘ইলাহাইন’ এবং বহুবচন ‘আলিহাতুন’ যেটি আহ্বান প্রকাশকারী উপসর্গ ‘ইয়া’ ব্যবহার না করার শূন্যস্থান পূরণ করে। এর অর্থ দাঁড়ায়, হে আল্লাহ্। এ ধরনের আহ্বানের উদাহরণ রয়েছে পবিত্র কুরআনে। যেমন : মরিয়ম পুত্র ঈসা বলল, ‘আল্লাহুম্মা’ অর্থাৎ হে আল্লাহ্! আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্য আসমান থেকে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্ছা পাঠাও।” (১১ : ১১৪) এবং মহানবী (সা.)-কে বলতে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহুম্মা’ অর্থাৎ হে সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী আল্লাহ্! তুমি যাকে ইচ্ছা রাজত্ব দান করো এবং যার থেকে ইচ্ছা রাজত্ব কেড়ে নাও।” (৩ : ২৬) আল্লাহ্র সার্বভৌমত্ব ও পরিপূর্ণতা কুরআনের একেবারে প্রথম শব্দগুলোতেই বর্ণিত হয়েছে। তিনিই সমগ্র সৃষ্টির স্রষ্টা, লালনকর্তা ও প্রভু।
‘আমি তোমার কাছে আকুতি জানাই’-এর অর্থ দাঁড়ায়, প্রার্থনাকারী আল্লাহ্ ছাড়া আর কাউকেই প্রার্থনা পাওয়ার উপযুক্ত মনে করে না, আর ‘তোমার রহমত-এর উসিলায় যা সমস্ত কিছুকে পরিব্যাপ্ত করে’-এ কথাগুলো কুরআনের সাত নম্বর সূরার ১৫৬ নম্বর আয়াতেরই পুনরাবৃত্তি।
وَبِقُوَّتِكَ الَّتِي قَهَرْتَ بِهَا كُلَّ شَيٍْء وَخَضَعَ لَهَا كُلُّ شَيٍْء وَذَلَّ لَهَا كُلُّ شَيٍْء
আর তোমার পরাক্রমের উসিলায় যা দিয়ে তুমি সমস্ত কিছুকে পদানত করো এবং যার কাছে বস্তুনিচয় আনত হয় ও আনুগত্য প্রদর্শন করে।
পবিত্র কুরআনের ৩৯ নম্বর সূরার ৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তিনি আল্লাহ্ এক ও প্রবল পরাক্রমশালী।’ ‘আল কাহ্হার’ (পদানতকারী) হচ্ছে আল্লাহ্র একটি গুণবাচক নাম যে শব্দের ব্যাখ্যা করে ২ নম্বর সূরার ১৬৫ নম্বর আয়াত। এ আয়াতে বলা হয়েছে : ‘সমস্ত শক্তি আল্লাহ্রই।’
وَبِجَبرُوتِكَ الَّتِي غَلَبْتَ بِهَا كُلَّ شَيٍْء
এবং তোমরা প্রতাপের উসিলায় যা দিয়ে তুমি সমস্ত কিছুকে বিজিত করেছ।
এখানে ‘জাবারুত’ (প্রতাপ বা প্রবল শক্তি) শব্দটি এসেছে আল্লাহ্র গুণবাচক নাম ‘আল জাব্বার’ থেকে, যার অর্থ ‘প্রতাপশালী প্রভু’।
وَبِعِزَّتِكَ الَّتِي لا يَقُومُ لَهَا شَيْءٌ
এবং তোমার মহামর্যাদার উসিলায় যার সম্মুখে কোন কিছুই দাঁড়াতে পারে না।
‘ইজ্জত’ শব্দটি গৃহীত হয়েছে আল্লাহ্র গুণবাচক নাম ‘আল আযীম’ (মহামর্যাদাবান) হতে।
وَبِعَظَمَتِكَ الَّتِي مَلَأَتْ كُلَّ شَيٍْء
এবং তোমার অপার মহিমার উসিলায় যা সমস্ত কিছুর ওপর বর্তমান।
কুরআনের ২ নম্বর সূরার ২৫৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে : ‘আল্লাহ্, তিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সর্বাধিষ্ঠ বিশ্ববিধাতা।’
وَبِسُلْطَانِكَ الَّذِي عَلاَ كُلَّ شَيٍْء
এবং তোমার কর্তৃত্বের উসিলায় যা সমস্ত কিছুর ওপর কর্তৃত্বশীল।
‘হে প্রভু! যাঁর কর্তৃত্বের কাছে বাকী সবাই অসহায়।’ (দোয়া জওশন কাবীর) পার্থিব কোন শক্তিই অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে পূর্ব জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেমন ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ইত্যাদির কিছুই প্রতিরোধ করতে পারে না।
وَبِوَجْهِكَ الْبَاقِي بَعْدَ فَنَاءِ كُلِّ شَيٍْء
এবং তোমার আপন সত্তার উসিলায় যা সমস্ত কিছু ধ্বংস হয়ে যাবার পরও স্থায়ী থাকবে।
‘ওয়াজহিকা’ শব্দটিকে মালবুবী ব্যাখ্যা করেছেন মহান আল্লাহ্র সত্তা হিসাবে। কুরআন এক আয়াতে বলেছে, ‘আল্লাহ্র সত্তা ছাড়া সমস্ত কিছুই ধ্বংসশীল।’ (২৮ : ৮৮) অন্য আয়াতে বলেছে, ‘এবং অবিনশ্বর কেবল তোমার প্রতিপালকের সত্তা, যিনি মহিমাময়, মহানুভব।’ (৫৫ : ২৭)
وَبِأَسْمَائِكَ الَّتِي مَلَأَتْ أَرْكَانَ كُلِّ شَيٍْء
এবং তোমার নামসমূহের উসিলায় যা সমস্ত কিছুর ওপর তোমার ক্ষমতা প্রকাশ করে।
এখানে ‘আসমাউল হুসনা’ অর্থাৎ আল্লাহ্র সুন্দর নামসমূহের কথা বলা হয়েছে। মালবুবী বলেন, এ নামগুলোই সমস্ত সৃষ্ট অস্তিত্বের উৎস।
وَبِعِلْمِكَ الَّذِي أَحَاطَ بِكُلِّ شَيٍْء
এবং তোমার মহাপ্রজ্ঞার উসিলায় সমস্ত কিছু যার অধীন।
মহান আল্লাহ্র অন্যতম গুণবাচক নাম হচ্ছে ‘সর্বজ্ঞ’। কুরআন বলে, ‘বস্তুত সমস্ত কিছুই আল্লাহ্র জ্ঞানের অধীন।’ (৬৫ : ১২) ‘আল মুহীতুন’ আল্লাহ্র একটি গুণবাচক নাম, এর অর্থ হচ্ছে সমস্ত কিছুর স্রষ্টা ও অনুধাবনকারী।
وَبِنُورِ وَجْهِكَ الَّذِي أَضَاءَ لَهُ كُلُّ شَيٍْء
এবং তোমার সত্তার নূরের উসিলায় যা সমস্ত কিছুকে আলোকিত করে।
‘ওয়াজ্হ’ শব্দের বিস্তৃত অর্থ রয়েছে। মালবুবীর মতে, এখানে ‘তাঁর আপন সত্তার নূর’-এর কথা বলা হয়েছে। ৫৫ নম্বর সূরার ২৭ নম্বর আয়াতে ব্যবহৃত এ একই শব্দের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইমাম জয়নুল আবেদীন (আঃ) বলেন, ‘ইমামরাই হলেন আল্লাহ্র “ওয়াজাহ”।’- (তাফসীরে সাফী)
ইমাম রেজা (আঃ) বলেছেন, ‘আল্লাহর ওয়াজাহ বলতে নবী-রাসূল ও ইমামদের বোঝানো হয়েছে।’
يَّا نُورُ يَا قُدُّوسُ يَا أَوَّلَ الأَوَّلِيْنَ وَ يَا آخِرَ الآخِرِينَ
হে নূর! হে পবিত্রতম! হে তুমি যে অনাদিকাল হতে বিরাজমান। হে তুমি যে সবকিছু শেষ হয়ে যাবার পরও থাকবে।
এ আয়াতগুলো অর্থ হচ্ছে যে, আল্লাহ্র কোন শুরু নেই, শেষও নেই।
اَللَّهُمَ اغْفِرْ لِي الذُّنُوبَ الَّتِي تَهتِكُ الْعِصَمَ
হে আল্লাহ্! আমার ঐ সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দাও যা সংযমের বাঁধ ভেঙ্গে দেয়।
‘ইসাম’ শব্দটি ‘ইসমাত’ শব্দের বহুবচন, যার অর্থ খুঁতহীনতা, প্রতিরক্ষা বা সংযম। যদিও খুঁতহীনতা ও নিষ্পাপত্ব ইমাম ও নবীদের জন্যই সংরক্ষিত, তথাপি প্রত্যেক মানুষকেই আল্লাহ্ তায়ালা পাপ থেকে নিজেকে দূরে রাখার শক্তি দিয়েছেন। কিন্তু কিছু কিছু পাপ আছে যেগুলো করা হলে মানুষের আত্মসংযমের বাঁধ ভেঙ্গে যায় এবং সে একজন চরিত্রহীন মানুষে পরিণত হয়। আল্লাহ্ আমাদের ঐ সব পাপ থেকে হেফাযত করুন। ইমাম জাফর সাদিক (আঃ)-এর উক্তি অনুসারে নিম্নলিখিত পাপগুলো একজন ব্যক্তির আত্মসংযম বিনষ্ট করে : মদ্পান ও নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন, জুয়াখেলা, তামাশা ও বিদ্রূপপূর্ণ খেলায় অংশগ্রহণ, অপর মানুষের দোষ-ক্রুটি নিয়ে গল্প করা এবং সন্দেহবাদী ও নাস্তিকদের সঙ্গে ওঠাবসা করা।
اَللَّهُمَ اغْفِرْ لِيَ الذُّنُوبَ الَّتِي تُنْزِلُ النِّقَمَ
হে আল্লাহ্! আমার ঐ সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দাও যা দুর্যোগ ডেকে আনে।
একটি হাদীস অনুসারে নিম্নলিখিত পাপগুলো দুর্যোগ ডেকে আনে :
চুক্তি ভঙ্গ করা, লজ্জাকর কাজ প্রকাশ করা, আল্লাহ্র স্পষ্ট নির্দেশের বিপরীতে রায় প্রদান করা, জাকাত প্রদানে অস্বীকার করা বা বাধা দেয়া, মাপে কম দেয়া।
اَللَّهُمَ اغْفِرْ لِيَ الذُّنُوبَ الَّتِي تُغيِّرُ النِّعَمَ
হে আল্লাহ্! আমার ঐ সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দাও যা তোমার নেয়ামতসমূহকে (গজবে) পরিবর্তিত করে দেয়।
হযরত জাফর সাদিক (আঃ) বলেন, ‘ঐ সমস্ত পাপ হচ্ছে : মানুষের প্রতি অন্যায় আচরণ করা, একজন আলেমকে চুপ করিয়ে দেয়া বা তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করা, আল্লাহ্র রহমতের প্রতি অকৃতজ্ঞ হওয়া এবং আল্লাহ্র সাথে শরীক করা। তিনি নেয়ামত ধ্বংসকারী পাপের মধ্যে নিম্নলিখিত পাপগুলোও যুক্ত করেছেন :
নিজের দারিদ্র্য প্রচার করা, আল্লাহ্র অনুগ্রহের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হওয়া, আল্লাহ্র বিরুদ্ধে অভিযোগ করা।
اَللَّهُمَّ اغْفِرْ لِيَ الذُّنُوبَ الَّتِي تَحْبِسُ الدُّعَاءَ
হে আল্লাহ্! আমার ঐ সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দাও যা দোয়া কবুল হওয়ার পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়।
হযরত সাদিক (আঃ)-এর হাদীস অনুসারে এ সমস্ত পাপ হচ্ছে : বিকৃত ঈমান পোষণ, দোয়া কবুল হওয়ার ব্যাপারে অবিশ্বাস, ভাইয়ের প্রতি মুনাফেকী, সময়মত নামাজ না পড়া এবং পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব পালন না করা।
َللَّهُمَّ اغْفِرْ لِيَ الذُّنُوبَ الَّتِي تُنْزِلُ البَلآءَ
হে আল্লাহ্! আমার ঐ সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দাও যা দুর্ভাগ্য (বা কষ্ট) ডেকে আনে।
ইমাম জয়নুল আবেদীন (আঃ)-এর হাদীস অনুসারে নিম্নলিখিত পাপগুলো দুর্ভাগ্য বা কষ্ট নিয়ে আসে :
যারা কষ্টে আছে তাদের সাহায্য না করা, নির্যাতিত ব্যক্তি, যারা সাহায্য প্রার্থনা করছে, তাদের রক্ষাকল্পে অগ্রসর না হওয়া এবং সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের প্রতিরোধের বিরুদ্ধাচরণ করা।
اَللَّهُمَّ اغْفِرْ لِيَ الذُّنُوبَ الَّتِي تَقْطَعُ الرَّجَاءَ
হে আল্লাহ্! আমার ঐ সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দাও যা আশাকে বিনষ্ট করে দেয়।
যদিও এ বাক্য শেখ আব্বাস কুমী’র সংস্করণ থেকে বাদ পড়েছে, তবে এটি অন্যান্য নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ ও তাফসীরসমূহের রয়েছে।
হযরত সাদিক (আঃ)-এর হাদীস অনুসারে নিম্নলিখিত পাপগুলো আশা বিনষ্ট করে :
আল্লাহ্র অনুগ্রহের ব্যাপারে নিরাশ হওয়া, আল্লাহ্র ক্ষমাশীলতায় আস্থা না রাখা, আল্লাহ্র পাশাপাশি অন্য কারো ওপর ভরসা করা এবং আল্লাহ্র প্রতিশ্রুতিতে অবিশ্বাস করা।
একই ধরনের বক্তব্য পাই আমরা ইমাম জয়নুল আবেদীন (আঃ)-এর সহীফায়ে সাজ্জাদীয়ায়। তিনি বলেন, ‘একজন অভাবগ্রস্ত মানুষের কাছে আর এক অভাবী ব্যক্তির প্রার্থনা করাটা স্বাভাবিক বিবেক-বুদ্ধির খেলাফ ছাড়া আর কিছু নয়! কত লোক তোমাকে ছাড়া অপরের কাছে সম্মান চেয়েছে, আর অপমানিত হয়েছে। যারা তোমাকে ছেড়ে অন্য কারো কাছে সম্পদ চেয়েছে, দারিদ্র্য তাদের আঘাত হেনেছে, আর যারা তোমাকে ছেড়ে অপর কারো কাছে শ্রেষ্ঠত্ব চেয়েছে, তারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে।’
মুহাম্মদ ইবনে আজলান বর্ণনা করেন : ‘একবার আমি বিপদে এতোই অসহায় হয়ে পড়েছিলাম যে, আমি তখনকার মদীনার গভর্ণর হাসান ইবনে জায়েদের কাছে আর্থিক সাহায্য প্রার্থনা করার সিদ্ধান্ত নেই। যেহেতু সে এককালে আমার বন্ধু ছিল, তাই আমার ধারণা ছিল, সে আমার প্রতি সহানুভূতিশীল হবে। গভর্ণরের বাসভবনের পথে আমার সাথে ইমাম বাকের (আঃ)-এর পৌত্র মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ্র দেখা হয়। আমার উদভ্রান্ত অবস্থা দেখে তিনি জানতে চাইলেন আমি কোথায় যাচ্ছি। আমি তাঁকে আমার অবস্থা খুলে বললাম এবং জানালাম যে, হাসান ইবনে জায়েদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা ছাড়া অন্য কোন উপায় দেখছি না। তিনি বললেন, “তোমার প্রয়োজন পূর্ণ হবে না। কারণ, নিশ্চয়ই আমি আমার চাচা ইমাম জাফর আস সাদিক (আঃ)-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর কোন নবীর কাছে এ আয়াত নাযিল করেছেন, “আমার মহাশক্তি ও মহাপরাক্রমের শপথ, আমি প্রত্যেক লোকের আশাকে বিনষ্ট করে দেবো যারা আমাকে ছাড়া অন্য কারও কাছ থেকে সাহায্য পাবার আশা করে। আর আমি তাকে মানুষের সামনে অপমানিত করবো এবং আমার রহমত ও বরকত থেকে তাকে আরো দূরে সরিয়ে দেবো। আমার দাস কি তার বিপদে আমাকে ছাড়া অন্য কারও কাছ থেকে উদ্ধারের আশা করে, অথচ আমিই সমস্ত নিয়তির নিয়ন্তা। সে কি অন্য কারও কাছ থেকে কিছু পাবার আশা রাখে, যেখানে আমিই সমস্ত সম্পদের মালিক এবং চূড়ান্ত উদারতার অধিকারী”।’
اَللَّهُمَّ اغْفِرْ لِيْ كُلَّ ذَنْبٍ أَذْنَبْتُهُ وَكُلَّ خَطِيئَةٍ أَخْطَأْتُهَا
হে আল্লাহ্! আমার কৃত সমস্ত পাপ ও ত্রুটি ক্ষমা করে দাও।
‘পাপ’ আর ‘ভুল’ এ দু’টি আলাদা। কেননা, ভুল অসাবধানতাবশত হয়ে যেতে পারে। ‘মানুষ মাত্রই ভুল করে’; তাই ভুল হওয়াটা অত্যন্ত স্বাভাবিক। ‘পাপ’ মানে ইচ্ছাকৃত অন্যায়, আর ‘ভুল’ হচ্ছে সদিচ্ছা সত্ত্বেও ত্রুটি। যেহেতু দু’টিই যথেষ্ট ক্ষতির জন্ম দিতে পারে, তাই উভয়ের জন্যই আল্লাহ্র করুণা ও ক্ষমা প্রয়োজন।
পবিত্র কুরআনের ৪ নম্বর সূরার ১৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ্ অবশ্যই সেসব লোকের তওবা গ্রহণ করবেন, যারা ভুলবশত মন্দ কাজ করে ফেলে এবং সত্বর তওবা করে, এদেরকে আল্লাহ্ তায়ালা ক্ষমা করেন, আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়।’
اَللَّهُمَّ إِنِّي أَتَقَرَّبُ إِلَيْكَ بِذِكْرِكَ
হে আল্লাহ্! তোমার স্মরণের (জিকির) মাধ্যমে তোমার নৈকট্য লাভের সাধনা করি।
সমস্ত নামাজ, সমস্ত ইবাদত, সমস্ত দান ও সৎ কাজ হতে হবে কেবল আল্লাহ্র নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে। কার্যত একজন মুমিনের গোটা জীবন পরিচালিত হওয়া উচিত কেবল এ লক্ষ্যেই, এর জন্যই প্রত্যেক মানুষ আর জীনকে সৃষ্টি করা হয়েছে। কুরআন বলে, ‘অতঃপর সে যদি (আল্লাহ্র) নৈকট্য লাভকারীদের একজন হয়, তার জন্য রয়েছে আরাম, উত্তম জীবনোপকরণ ও সুখকর উদ্যান।’ (৫৬ : ৮৮-৮৯)
وَأَسْتَشْفِعُ بِكَ إِلَى نَفْسِكَ
এবং আমি তোমার কাছে আবেদন জানাই আমার পক্ষ হতে সুপারিশ করার জন্য।
সুপারিশ করার অধিকার একমাত্র আল্লাহ্র হাতেই নিবদ্ধ। ৩৯ নম্বর সূরার ৪৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘বল, সকল সুপারিশ আল্লাহ্রই ইখতিয়ারে।’ তবে তিনি ইচ্ছা করলে অন্যদের সুপারিশের অনুমতি দিতে পারেন। ২০ নম্বর সূরার ১০৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘ঐ দিন কেবল মহাদয়ালু আল্লাহ্ যাকে অনুমতি দান করবেন এবং যার কথা তিনি পছন্দ করবেন সে ছাড়া কারো সুপারিশই কোন কাজে আসবে না।’
وَأَسْألُكَ بِجُودِكَ أَن تُدْنِيَنِي مِن قُرْبِكَ
আমি তোমার কাছে তোমার মহানুভবতার উসিলায় আবেদন জানাচ্ছি যেন তুমি আমাকে তোমার নৈকট্য দান কর।
আল্লাহ্র নৈকট্য লাভই একজন মানুষের পূর্ণতা প্রাপ্তি নির্দেশ করে।
وَأَن تُوزِعَنِي شُكْرَكَ تُلْهِمَنِي ذِكْرَكَ
এবং আমাকে তওফীক দাও যেন আমি তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ হই এবং আমাকে অনুপ্রাণিত করো তোমার স্মরণের প্রতি ও নিয়ত তোমাকে ডাকার প্রতি।
‘আল্লাহ্র প্রতি কৃতজ্ঞতা’ মানে হচ্ছে তাঁর আদেশ-নিষেধের প্রতি একান্ত অনুগত হওয়া এবং প্রতি মুহূর্তে তাঁকে স্মরণ করা। প্রতি মুহূর্তে তাঁর স্মরণ আমাদেরকে পাপ হতে বিরত রাখে এবং আমাদের অন্তরকে প্রশান্ত করে। কুরআন বলে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ্র স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।’
اَللَّهُمَّ إِنِّي أَسْألُكَ سُؤَالَ خَاضِعٍ مُّتَذَلِّلٍ خَاشِعٍ أَن تُسَامِحَنِي وَتَرْحَمَنِي
হে আল্লাহ্! আমি তোমার কাছে নিবেদন জানাই পূর্ণ আনুগত্যে, বিনয়াবনত চিত্তে ও ভীত-বিহ্বল অন্তরে।
আল্লাহ্র কাছে প্রার্থনা করার জন্য এগুলো হচ্ছে অত্যাবশ্যকীয় পূর্বশর্ত। একজন ব্যক্তিকে অবশ্যই (খোদার প্রতি) ভীত-বিহ্বল হতে হবে এবং বিচার দিনে ভয়ংকর পরিণামের বিষয়ে শংকিত থাকতে হবে। (কুরআনের ১৩ নম্বর সূরার ২১ নম্বর আয়াত)
وَتَجْعَلَنِي بِقَسَمِكَ رَاضِيًا قَانِعًا،
যেন আমার প্রতি তুমি ক্ষমাশীল ও দ্য়ার্দ্র হও এবং তোমার দেয়া বরাদ্দে যেন খুশী ও পরিতৃপ্ত থাকতে পারি, আমাকে এমন তওফীক দাও।
প্রার্থনাকারী তার পাপ ও দুর্বলতার প্রতি আল্লাহ্ তায়ালার ক্ষমাশীলতা এবং অপরের কাছে ভিক্ষা না করেও আল্লাহ্ কর্তৃক জীবন যাপনে প্রয়োজনীয় যে সমস্ত জিনিসের অধিকারী হয়েছে তার জন্য সন্তুষ্টচিত্ততা প্রার্থী। হযরত আলী (রা.)-এর একটি হাদীসে বলা হয়েছে, ‘যে সন্তুষ্টচিত্ত সে সম্মানিত হয়, আর যে অধিক প্রার্থনা করে সে অপমানিত হয়।’ আরেকটি হাদীসে বলা হয়েছে, ‘যে সন্তুষ্টচিত্ত সে ক্ষুধার্ত কিংবা উলঙ্গ হলেও স্বয়ংসম্পূর্ণ, যে ব্যক্তি তুষ্টচিত্ত সে তার সময়ের লোকদের ওপর বিজয়ী ও তার প্রজন্মের লোকদের চেয়ে বেশি সম্পদের অধিকারী, যে ব্যক্তি তুষ্ট সে অপমানিত হওয়ার চেয়ে আত্মনির্ভরতা বেছে নিয়েছে এবং কষ্টের বদলে বেছে নিয়েছে আনন্দ।’
আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী (রা.) বলেছেন, ‘আমি ধনী হতে চেয়েছিলাম এবং তুষ্টচিত্তের চেয়ে আর কিছুতে তা পাইনি। সুতরাং, তোমাদের উচিত জ্ঞান অর্জন করা, যা তোমাদের উভয় জগতের মর্যাদা ও গৌরব এনে দেবে। আমি মহত্ত্ব অর্জন করতে চেয়েছি এবং খোদাকে ভয় করা ছাড়া আর কিছুতেই তা পাইনি। অতএব, আল্লাহ্কে ভয় করো এবং মহান হও। আমি প্রশান্তি খুঁজেছি এবং তা পেয়েছি লোকজনের সাথে অতিরিক্ত মেলামেশা ত্যাগ করে। সুতরাং দুনিয়াদার লোকদের সঙ্গ ছাড়ো, প্রশান্তি খুঁজে পাবে।’
রাসূলে কারীম (সা.) বলেছেন, ‘পরিতৃপ্তি হচ্ছে এমন এক সম্পদ যার কোন ক্ষয় নেই।’
وَفِي جَمِيعِ الأَحْوَاِل مُتَوَاضِعًا
আর আমাকে যে কোন পরিস্থিতিতে বিনম্র ও বিনয়ী রাখো।
হাদীস শরীফে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি বিনয়ী ও অপরের সাথে বিনম্র আচরণ করে আল্লাহ্ তাকে সম্মানিত করেন, কিন্তু যে দুর্বিনীত সে অবমাননার শিকার হয়।
اَللَّهُمَّ وَأَسْألُكَ سُؤَالَ مَنِ اشْتَدَّتْ فَاقَتُهُ وَأَنْزَلَ بِكَ عِنْدَ الشَّدَائِدِ حَاجَتَهُ وَعَظُمَ فِيمَا عِنْدَكَ رَغْبَتُهُ
হে আল্লাহ্! আমি তোমার কাছে প্রার্থনা জানাই এমন এক ব্যক্তির মতো যে চরম সংকটে নিপতিত হয়ে তোমার কাছে তার প্রয়োজন ভিক্ষা করছে এবং তোমার কাছে যা আছে তা তার আশাকে বহু গুণ বর্ধিত করেছে।
বেহেশত, ক্ষমা ও মানব জাতির জন্য আর যা কিছু কল্যাণকর সবই আল্লাহ্র নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু আশা ও শংকা একত্রে থাকা প্রয়োজন। আমাদের একটি দোয়াতে আমরা প্রার্থনা করি, ‘হে প্রভু! যার থেকে আমি প্রতিটি ভালো কাজের জন্য (পুরস্কারের) আশা করি এবং প্রতিটি গুনাহর জন্য যার ক্রোধকে ভয় করি।’
হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, ‘যখন আশা ও ভীতি একজন মুমিনের অন্তরে সহাবস্থান করে তখন আমি তার জন্য বেহেশত ফরজ করে দেই।’
اَللَّهُمَّ عَظُمَ سُلْطَانُكَ وَعَلاَ مَكَانُكَ
হে আল্লাহ্! বিশাল তোমার সাম্রাজ্য এবং মহিমান্বিত তোমার মর্যাদা।
এ কথাগুলো পূর্ববর্তী বাক্যের পরিপূরক যেখানে একজন মানব সন্তান তার সংকট দূরীকরণে নিজের অক্ষমতা স্বীকার করে তার প্রভুর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছে যাঁর সাম্রাজ্য বিশাল ও যাঁর শক্তি দুর্দমনীয়।
وَخَفِيَ مَكْرُكَ وَظَهَرَ أَمْرُكَ وَغَلَبَ قَهْرُكَ وَجَرَتْ قُدْرَتُكَ وَلا يُمْكِنُ الْفِرَارُ مِنْ حُكُومَتِكَ
তোমার পরিকল্পনা দৃশ্যাতীত, তোমার ক্ষমতা স্পষ্ট, তোমার শক্তি বিজয়ী, তোমার কর্তৃত্ব সর্বব্যাপী এবং তোমার সীমানা থেকে পলায়ন অসম্ভব।
ইমাম হুসাইন (রা.) বর্ণনা করেন যে, এক লোক তাঁর পিতা আমীরুল মুমিনীন (রা.)-এর কাছে এসে বললো, ‘আমি একজন পাপী এবং পাপের তাড়না থেকে মুক্ত হওয়াটা আমার জন্য কঠিন, এখন আমার জন্য আপনার উপদেশ কি?’
আমীরুল মুমিনীন (রা.) এভাবে লোকটিকে ভৎসনা করলেন, ‘তুমি যদি এ পাঁচটি শর্ত পূরণ করতে পার তাহলে ইচ্ছা মতো পাপ করতে পার।
প্রথমত আল্লাহ্প্রদত্ত রিযিক ভোগ ত্যাগ করো; দ্বিতীয়ত আল্লাহ্র সীমানা থেকে বেরিয়ে যাও; তৃতীয়ত এমন একটা জায়গা খুঁজে নাও যেটা আল্লাহ্র দৃষ্টির আড়াল; চতুর্থত এমন ক্ষমতা অর্জন করো যাতে মৃত্যুর ফেরেশতাকে তোমার জান কবজে বাধা দিতে পারো এবং পঞ্চমত এমন শক্তি অর্জন করো যাতে দোজখের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতা ‘মালিক’ তোমাকে দোজখে ছুঁড়ে দিতে চাইলে তুমি তা প্রতিরোধ করতে পার। এ পাঁচটি কাজ যদি করতে পার, তবে খুশী মতো পাপ করতে কোন বাধা নেই।’
اَللَّهُمَّ لا أَجِدُ لِذُنُوبِي غَافِرًا وَلا لِقَبَائِحِي سَاتِرًا
হে আল্লাহ্! তুমি ছাড়া আমার পাপ ক্ষমা করার কিংবা আমার ঘৃণ্য কাজগুলো গোপন করে রাখার আর কেউ নেই।
কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘এবং আল্লাহ্ ছাড়া কে পাপ ক্ষমা করবে?’ (৩ নম্বর সূরার ১৩৫ নং আয়াত) সুপারিশ সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ্র ইখতিয়ারভুক্ত, যদিও তাঁর অনুমতি সাপেক্ষে কারো কারো পক্ষে সুপারিশ করা সম্ভব। (কুরআনের ২ নম্বর সূরা ২৫৫ আয়াত)
‘সাতির’ (তাঁর দাসদের ঘৃণ্য কাজসমূহ গোপনকারী) হচ্ছে আল্লাহ্ তায়ালার অন্যতম গুণ। তাঁর অসীম করুণা দিয়ে তিনি আমাদের বহু জঘন্য কাজ সমাজে গোপন রাখেন, কিন্তু গুণসমূহ প্রকাশ করেন। একটি দোয়ায় আমরা বলি, ‘হে প্রভু! আমাদের প্রশংসাযোগ্য কাজগুলো স্পষ্ট করো আর জঘন্য কাজগুলো গোপন রাখো।’
وَلا لِشَيٍْء مِّنْ عَمَلِيَ الْقَبِيحِ بِالْحَسَنِ مُبَدِّلاً غَيْرَكَ
আমার মন্দ ক্রিয়াগুলোকে সদগুণে রূপান্তরিত করার জন্যও তুমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই।
কেবল সর্বশক্তিমান আল্লাহ্ তায়ালাই পারেন আমাদের অসৎ কাজগুলোকে সৎ কাজে রূপান্তরিত করতে। আল কুরআন বলে, ‘তারা ব্যতীত যারা তওবা করে, ঈমান আনে ও নেক কাজ করে, আল্লাহ তাদের পাপ পরিবর্তন করে দেবেন পুণ্যের দ্বারা। আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, দয়ালু।’ (২৫ নম্বর সূরা, ৭০ নম্বর আয়াত)
لا إِلَهَ إِلا أَنْتَ سُبْحَانَكَ وَبِحَمْدِكَ ظَلَمْتُ نَفْسِي وَتَجَرَّأْتُ بِجَهْلِي وَسَكَنْتُ إِلَى قَدِيمِ ذِكْرِكَ لِي وَمَنِّكَ عَلَيَّ
তুমি ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই এবং সমস্ত প্রশংসা তোমারই। আমি আমার আত্মার ওপর জুলুম করেছি এবং আমার এ ধৃষ্টতা জন্মেছে আমার অজ্ঞতার কারণে। পাপ করতে গিয়ে আমি নির্ভর করেছিলাম আমার অতীত যিকির এবং আমার প্রতি তোমার অতীত দয়ার ওপর।
এটা ঠিক যে, আল্লাহ্ তায়ালা সব সময় দয়ার্দ্র্য, কিন্তু তাঁর দয়াকে পাপ করার লাইসেন্স হিসাবে গ্রহণ করা এবং নিজ আত্মাকে পরকালীন শাস্তির উপযুক্ত করা চরম ধৃষ্টতা ও বোকামি ছাড়া আর কিছুই নয়। এ বাক্য আমাদের শিক্ষা দেয় যে, প্রতিটি পাপই আত্মার কষ্টের কারণ হবে, যদি তাৎক্ষণিক অনুশোচনা ও আল্লাহ্র কাছে মাফ চাওয়া না হয়।
মনসুর-উল-আম্মার বর্ণনা করেন, একবার তিনি মধ্যরাতে পথ চলার সময় শুনতে পেলেন এক যুবক করুণ সুরে আল্লাহ্র কছে প্রার্থনা করে বলছে : ‘হে প্রভু! এইমাত্র আমি যে পাপ করলাম তা তোমাকে অমান্য বা অস্বীকার করার উদ্দেশে আমি করিনি, বরং এটা ঘটেছে কেবল আমার লালসা ও শয়তানের প্ররোচনার কারণে। আমি আমার আত্মার ওপর জুলুম করেছি এবং একে তোমার শাস্তি পাবার যোগ্য করে ফেলেছি।’ মনসুর বলেন, ‘যুবকটির এসব প্রার্থনা বাক্য শুনে আমি তাঁর ঘরের দরজার কাছে গিয়ে উঁচু কণ্ঠে কুরআনের এ আয়াত পড়লাম, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে ও নিজেদের পরিবারবর্গকে এমন আগুনের হাত থেকে বাঁচাও, যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর। এখানে নিযুক্ত রয়েছে শক্তিশালী ও কঠিন ফেরেশতাদল, তারা আল্লাহ্র আদেশের অন্যথা করে না এবং তাদের যা নির্দেশ দেয়া হয় তারা ঠিক তা-ই করে”।’ (৬৬ নং সূরা ৬ নং আয়াত) মনসুর আরো বলতে লাগলেন, ‘হে প্রভু! দোজখের জ্বালানি হবার শক্তি আমার এ দুর্বল শরীরের নেই।’ তারপর মনসুর ঐ জায়গা থেকে চলে গেলেন। তিনি আরো বলেন, ‘পরদিন যখন ঐ যুবকের বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম তখন আমি মহিলাদের কান্নার রোল শুনতে পেলাম। কান্নার কারণ জিজ্ঞাসা করতে গেলে এক বৃদ্ধা মহিলা আমাকে বললেন, “গত রাতে যখন আমার ছেলেটা খোদার কাছে দোয়া করছিলো তখন এক লোক দরজার কাছ থেকে কুরআনের এক কঠিন শাস্তির এক আয়াত আবৃত্তি করে; এটা শুনে আমার ছেলে চিৎকার করে মাটিতে পড়ে যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে প্রাণত্যাগ করে।” মনসুর ঐ বৃদ্ধাকে বললেন, যেহেতু তিনিই তাঁর সন্তানের মৃত্যুর কারণ, অতএব, তিনিই মুর্দাকে গোসল ও কাফন পরাতে ইচ্ছুক। বৃদ্ধা তাঁকে অনুমতি দিলেন। মনসুর বলেন, ‘আমি যুবকটির ঘরে প্রবেশ করে দেখলাম তার মুখ কেবলার দিকে ফেরানো এবং তার বুকের ওপর স্পষ্ট অক্ষরে লেখা আমি তওবার পানিতে এ বান্দার গোসল দিয়েছি, এখন আমার দাস পাপমুক্ত।’
اللَّهُمَّ مَوْلايَ كَمْ مِّنْ قَبِيحٍ سَتَرْتَهُ وَكَمْ مِّن فَاِدحٍ مِّنَ البَلاءِ أَقَلْتَهُ
হে আল্লাহ্! আমার কত জঘন্য পাপকে তুমি গোপন করেছ, আমার কত কঠিন কষ্টকে তুমি সহনীয় করে দিয়েছ।
‘মাওলা’ শব্দটি এখানে ব্যবহার করা হয়েছে ‘প্রভু’ অর্থে এবং ‘ফাহিদিন’ অর্থ হচ্ছে ‘কঠিন’ বা ‘তীব্র’।
وَكَمْ مِّنْ عِثَارٍ وَّقَيْتَهُ وَكَمْ مِّن مَّكْرُوهٍ دَفَعْتَهُ وَكَمْ مِّنْ ثَنَاءٍ جَمِيلٍ لَّسْتُ أَهْلاً لَّهُ نَشَرْتَهُ
এবং কত বিচ্যুতি হতে আমাকে তুমি রক্ষা করেছ, কত নোংরা কাজ হতে আমাকে দূরে রেখেছ এবং আমার যোগ্যতার তুলনায় কত বেশি প্রশংসা তুমি চতুর্দিক ছড়িয়েছ!
মালবুবী আরবী শব্দ ‘ইতহার’-এর ফারসী অনুবাদ করেছেন ‘লাঘজিশ’ যার অর্থ হচ্ছে বিচ্যুতি, বিচ্যুত হওয়া বা ভ্রান্তির শিকার হয়ে পড়া। ‘মাকরুহীন’ শব্দের সাধারণ অর্থ কোন দূষণীয় কর্ম।
اَللَّهُمَّ عَظُمَ بَلائِي وَأَفْرَطَ بِي سُوءُ حَاِلي وَقَصُرَتْ بِي أَعْمَاِلي وَقَعَدَتْ بِي أَغْلاَلِي
হে আল্লাহ্! আমার যাতনা হয়েছে অসহনীয় এবং দুর্দশা অপরিমেয়, অপরাধপ্রবণতা তীব্র, অথচ সৎ কর্ম নগণ্য এবং আমার (পাপের) বোঝা হয়েছে কঠিনতর।
মালবুবীর মতে আরবী শব্দ ‘আফরাতা’ অর্থ তীব্রতর হয়েছে এবং ‘আগলাল’ যা ‘গাল্লা’-এর বহুবচন, এর মানে হচ্ছে এক কঠিন বন্দীদশা, যখন একজন মানুষ ভালো কাজ করার জন্য আল্লাহ্র তওফীক হতে বঞ্চিত হয়। কোন ব্যক্তির পাপের বোঝা যখন ভারী হয়ে যায়, তখন সে পাপের শেকলে জড়িয়ে পড়ে এবং ভালো কাজ করার ক্ষমতা রহিত হয়।
وَحَبَسَنِي عَن نَّفْعِي بُعْدُ آمَاِلي وَخَدَعَتْنِي الدُّنْيَا بِغُرُورِهَا وَنَفْسِي بِجِنَايَتِهَا (بِخِيَانَتِهَا) وَمِطَاِلي
এবং মিথ্যা আশার মরীচীকা আমাকে আমার মঙ্গল থেকে দূরে রেখেছে এবং দুনিয়া তার মোহমায়ায় আমাকে আবিষ্ট করেছে এবং আমার আপন সত্তা পরিণত হয়েছে বিশ্বাসঘাতকতা ও ছলনাপ্রবণতার শিকারে।
আরবী ‘নাফ্স’ শব্দকে এখানে অনুবাদ করা হয়েছে ‘নিজ সত্তা’ অর্থে। কুরআনের বিভিন্ন স্থানে ‘নাফ্স’ শব্দকে ভিন্ন ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন, ১২ নং সূরার ৫২ নম্বর আয়াতে ‘নাফসুল আম্মারা’ বলতে বোঝানো হয়েছে ‘মন্দ কাজপ্রবণ আত্মা’। ৮১ নং সুরার ১৮ নম্বর আয়াতে ‘নাফসুল মুতমাঈন্না’ মানে ‘প্রশান্ত আত্মা’ এবং ৭৫ নং সূরার ২ নং আয়াতে ‘নাফসুল লাউয়ামা’ অর্থ হচ্ছে ‘আত্মভৎসর্নাকারী আত্মা’। মালবুবী বলেন, মাজমা-উল-বাহরাইন গ্রন্থে লিপিবদ্ধ, হযরত আলী (রা.)-এর একটি হাদীসে বিভিন্ন প্রকার নাফ্সের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু এ দোয়ার আয়াতে প্রার্থনাকারী নিজ সত্তাকেই বোঝাতে চেয়েছে।
يَا سَيِّدِي فَأَسْأَلُكَ بِعِزَّتِكَ أَن لا يَحْجُبَ عَنْكَ دُعَآئِي سُوءُ عَمَلِي وَفِعَاِلي وَلا تَفْضَحْنِي بِخَفِيِّ مَا اطَّلَعْتَ عَلَيْهِ مِنْ سِرِّي وَلا تُعَاجِلْنِي بِالْعُقُوبَةِ عَلَى مَا عَمِلْتُهُ فِي خَلَوَاتِي مِنْ سُوءِ فِعْلِي وَإِسَاءَتِي وَدَوَامِ تَفْرِيطِي وَجَهَالَتِي وَكَثْرَةِ شَهَوَاتِي وَغَفْلَتِي
অতএব, হে আমার প্রভু! তোমার মহত্ত্বের নামে আমি কাতর মিনতি জানাই, আমার পাপ ও অপকর্মগুলো যেন আমার দোয়াকে তোমার দরজায় পৌঁছতে বাধাগ্রস্ত না করে এবং তুমি কিছুতেই তোমার জানা আমার গোপন বিষয়গুলো প্রকাশ করে দিয়ে আমাকে অপমানিত করো না এবং আমার অপরাধপ্রবণ মন, অজ্ঞতা, অতিরিক্ত লালসা ও গাফিলতির কারণে যেসব পাপ আমি গোপনে করেছি এবং আমার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে যেসব দোষ যুক্ত হয়েছে সেসবের কারণে আমার শাস্তি ত্বরান্বিত করো না।
وَكُنِ اللَّهُمَّ بِعِزَّتِكَ لِي فِي كُلِّ الأَحْوَاِل رَؤُوفًا وَّعَلَيَّ فِي جَمِيعِ الأُمُورِ عَطُوفًا
হে আল্লাহ্! আমি তোমার মহত্ত্বের উসিলায় তোমার কাছে নিবেদন জানাই সর্বাবস্থায় আমার প্রতি করুণাময় হতে এবং প্রতিটি বিষয়ে আমার প্রতি সদয় দৃষ্টি দিতে।
إِلَهِي وَرَبِّي مَن لِّي غَيْرُكَ أَسْأَلُهُ كَشْفَ ضُرِّي وَالْنَّظَرَ فِي أَمْرِي!
হে আমার প্রভু! প্রতিপালক! তুমি ছাড়া কি আমার এমন কেউ আছে যার কাছে আমি বিপদ মুক্তির আবেদন করতে কিংবা আমার সমস্যা অনুধাবনের প্রার্থনা জানাতে পারি?
মালবুবীর মতে বিপদ বাহ্যিক কিংবা আধ্যাত্মিক-উভয় ধরনেরই হতে পারে, যেগুলো কেবল আল্লাহ্ই বুঝতে ও লাঘব করতে পারেন। পবিত্র কুরআন বলে, ‘যিনি বিপদগ্রস্তের ডাকে সাড়া দেন এবং দুর্দশা লাঘব করেন।’ (সূরা নং ২৭, আয়াত নং ৬২) আল্লাহ্র অন্যতম গুণ হচ্ছে ‘বিপদ লাঘবকারী’ এবং প্রত্যেক নবী বিপদে তাঁর কাছেই মুক্তি চেয়েছেন।
إِلَهِي وَمَوْلايَ أَجْرَيْتَ عَلَيَّ حُكْمًا اتَّبَعْتُ فِيهِ هَوَى نَفْسِي، وَلَمْ أَحْتَرِسْ فِيهِ مِن تَزْيِيْنِ عَدُوِّي،
হে আমার উপাস্য! হে আমার প্রভু! তুমি আমার (জীবনে চলার) জন্য বিধান নির্ধারণ করেছ, কিন্তু তার পরিবর্তে আমি আমার হীন কামনার দাসত্ব করেছি এবং আমি শত্রুর প্ররোচনার বিরুদ্ধে সতর্ক থাকিনি।
এখানে শত্রু বলতে ইবলীসকে বোঝানো হয়েছে যে আল্লাহ্র সামনে ঘোষণা দিয়েছিল, ‘নিশ্চয়ই আমি পৃথিবীতে তাদের কাছে পাপ কর্মকে মনোমুগ্ধকর করে তুলবো এবং আমি তাদের সবাইকে বিপথগামী করে ছাড়বো।’ (সূরা নম্বর ১৫, আয়াত নম্বর ৩৯)
َغَرَّنِي بِمَا أَهْوَى وَأَسْعَدَهُ عَلَى ذَلِكَ القَضَاءُ فَتَجَاوَزْتُ بِمَا جَرَى عَلَيَّ مِنْ ذَلِكَ بَعْضَ حُدُودِكَ وَخَالَفْتُ بَعْضَ أَوَامِرِكَ
فَلَكَ الْحُجَّةُ عَلَيَّ فِي جَمِيعِ ذَلِكَ وَلا حُجَّةَ لِي فِيمَا جَرَى عَلَيَّ فِيهِ قَضَاؤُكَ،
সে আমাকে নিরর্থক আশার মায়াজালে বেঁধে নিয়েছে যা আমাকে টেনে নিয়েছে অধঃপাতে এবং নিয়তি তাকে সহায়তা দিয়েছে এ কর্মে। এভাবে আমি তোমার কিছু নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করেছি এবং আমি তোমার কিছু কিছু আদেশ অমান্য করেছি; অতএব, ঐ সমস্ত বিষয়ে আমার বিরুদ্ধে তোমার (যথার্থ) অভিযোগ রয়েছে এবং আমার প্রতি তোমার রায়ের বিরুদ্ধে আমার কোন অজুহাত নেই।
‘হুজ্জাত’ মানে হচ্ছে যুক্তি বা প্রমাণ, ওপরের বাক্যে ‘আল্লাহ্র দ্বারা হুজ্জাত’-এর তাৎপর্য হচ্ছে, পাপী স্বীকার করছে যে আল্লাহ্ তায়ালা যথাযথভাবেই তার বিরুদ্ধে রায় প্রদান করবেন। কেননা, আল্লাহ্ তায়ালা তাকে সঠিক পথে চলার জন্য রাসূল পাঠিয়েছেন, কুরআন নাজিল করেছেন এবং তাঁর আইন ব্যাখ্যা করার জন্য ইমামও নিযুক্ত করেছেন। পাপী আরও স্বীকার করছে যে, আল্লাহ্র আইন অমান্য করার পক্ষে তার কোন যুক্তিসংগত অজুহাত নেই।
وَأَلْزَمَنِي حُكْمُكَ وَبَلاؤُكَ تَيْتُكَ يَا إِلَهِي بَعْدَ تَقْصِيرِي وَإِسْرَافِي عَلَى نَفْسِي مُعْتَذِرًا نَّادِمًا، مُّنْكَسِرًا مُّسْتَقِيلاً77 ُّسْتَغْفِرًا مُّنِيبًا، مُّقِرًّا مُّذْعِنًا مُّعْتَرِفًا لا أَجِدُ مَفَرًّا مِّمَّا كَانَ مِنِّي وَلا مَفْزَعًا أَتَوَجَّهُ إِلَيْهِ في أَمْرِي غَيْرَ قَبُولِكَ عُذْرِي، وَإِدخَاِلكَ إِيَّايَ فِي سَعَةٍ مِّن رَّحْمَتِكَ اَللَّهُمَّ فَاقْبَل عُذْرِي ارْحَمْ شِدَّةَ ضُرِّي وَفُكَّنِي مِنْ شَدِّ وَثَاقِي يَا رَبِّ ارْحَمْ ضَعْفَ بَدَنِي وَرِقَّةَ جِلْدِي وَدِقَّةَ عَظْمِي يَا مَنْ بَدَأَ خَلْقِي وَذِكْرِي وَتَرْبِيَتِي وَبِرِّي وَتَغْذِيَتِي هَبْنِي لابْتِدَآءِ كَرَمِكَ وَسَاِلفِ بِرِّكَ بِي
তাই আমি (যথার্থভাবেই) তোমার বিচারের যোগ্য হয়েছি এবং শাস্তির উপযুক্ততা অর্জন করেছি। কিন্তু এখন আমি কর্তব্যহীনতা ও আমার আত্মার বিরুদ্ধে সীমা লঙ্ঘনের অপরাধে অপরাধী হওয়ার পর ক্ষমাপ্রার্থী অন্তরে অনুতপ্ত হয়ে ভগ্ন হৃদয়ে তোমার কাছে অবনত মস্তকে (আমার অপরাধ) স্বীকার করে তোমার কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করছি; কেননা, আমার কৃতকর্মের প্রতিফল ভোগ হতে মুক্তির কোন উপায় আমি দেখছি না এবং তোমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা এবং তোমার দয়ার বিশাল রাজ্যে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা ব্যতিরেকে আমার কোন পথও নেই। হে আল্লাহ্! আমার তওবা কবুল করো এবং আমার তীব্র যাতনার ওপর দয়ার্দ্র্য হও এবং আমাকে আমার ভারী (মন্দ কর্মের) শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করো। হে পালনকর্তা! আমার দুর্বল শরীরের ওপর দয়ার্দ্র্য হও এবং আমার কোমল ত্বক ও ভঙ্গুর হাড়গুলোর ওপর করুণা করো।
প্রভু! যে তুমি আমাকে সৃষ্টি করেছ, আমাকে ব্যক্তিত্ব দিয়েছ এবং আমার সুষ্ঠু প্রতিপালন নিশ্চিত করেছ এবং আমাকে রিযিক দিয়েছ দয়া করে আমার ওপর তোমার সেই পরিমাণ রহমত ও বরকত বর্ষণ পুনরায় আরম্ভ করো, যে পরিমাণ ছিল আমার জীবনের সূচনালগ্নে।
ِي وَسَيِّدِي وَرَبِّي َتُرَاكَ مُعَذِّبِي بِنَارِكَ بَعْدَ تَوْحِيدِكَ وَبَعْدَ مَا انْطَوَى عَلَيْهِ قَلْبِي مِن مَّعْرِفَتِكَ وَلَهِجَ بِهِ لِسَانِي مِنْ ذِكْرِكَ وَاعْتَقَدَهُ ضَمِيرِي مِنْ حُبِّكَ وَبَعْدَ صِدْقِ اعْتِرَافِي وَدُعَائِي خَاضِعًا لِّرُبُوبِيَّتِكَ هَيْهَاتَ أَنْتَ أَكْرَمُ مِنْ أَنْ تُضَيِّعَ مَن رَّبَّيْتَهُ أَوْ تُبْعِدَ مَنْ أَدْنَيْتَهُ أَوْ تُشَرِّدَ مَنْ آوَيْتَهُ أَوْ تُسْلِمَ إِلىَ الْبلآءِ مَن كَفَيْتَهُ وَرَحِمْتَهُ
হে আমার ইলাহ্! আমার মালিক! আমার প্রভু! আমার পালনকর্তা! তুমি কি তোমার প্রজ্বলিত আগুনে আমাকে দগ্ধ হয়ে শাস্তি পেতে দেখবে যদিও আমি তোমার একত্বে বিশ্বাস স্থাপন করেছি? যদিও আমার অন্তর পরিপূর্ণ তোমার (পবিত্র) জ্ঞানে, আমার জিহ্বা বারবার উচ্চারণ করেছে তোমার প্রশংসাধ্বনি এবং তোমার ভালবাসায় আমার অন্তর হয়েছে প্রেমার্ত এবং যখন আমি তোমার কর্তৃত্বের কাছে একান্ত হৃদয়ে ভুল স্বীকার করেছি এবং আকূল হৃদয়ে প্রার্থনা জানিয়েছি? না, যাকে তুমি নিজেই লালন-পালন করেছ তাকে ধ্বংস করা কিংবা যাকে তুমি নিজেই রক্ষণাবেক্ষণ করেছ তাকে তোমার থেকে দূরে তাড়িয়ে দেয়া, কিংবা যাকে তুমি নিজে আশ্রয় দিয়েছ কিংবা যাকে তুমি আদর-যত্ন করেছ এবং যার প্রতি তুমি দয়ার্দ্র্য থেকেছ, তাকে যন্ত্রণার মাঝে ত্যাগ করে ফেলে রাখার মতো তুমি নও। তুমি অনেক উঁচু স্তরের দয়ার অধিকারী, করুণাময়, দাতা।
وَلَيْتَ شِعْرِي يَا سَيِّدِي وَإِلَهِي وَمَوْلايَ أَتُسَلِّطُ النَّارَ عَلَى وُجُوهٍ خَرَّتْ لِعَظَمَتِكَ سَاجِدَةً وَعَلَى أَلْسُنٍ نَّطَقَتْ بِتَوْحِيدِكَ صَادِقَةً وَّبِشُكْرِكَ مَادِحَةً وَعَلَى قُلُوبٍ اعْتَرَفَتْ بِإِلَهِيَّتِكَ مُحَقِّقَةً وَعَلَى ضَمَائِرَ حَوَتْ مِنَ الْعِلْمِ بِكَ حَتَّى صَارَتْ خَاشِعَةً وَعَلَى جَواِرحَ سَعَتْ إِلَى أَوْطَانِ تَعَبُّدِكَ طَائِعَةً وَّأَشَارَتْ بِاسْتِغْفَارِكَ مُذْعِنَةً هَكَذَا الظَّنُّ بِكَ وَلا أُخْبِرْنَا بِفَضْلِكَ عَنْكَ
হে আমার মালিক! আমার ইলাহ্ ও প্রভু! আমার জানতে ইচ্ছে করে তুমি কি ঐসব মুখকে অগ্নিতে প্রজ্বলিত করবে যেসব মুখ তোমার মহত্ত্বের সম্মুখে সিজদাবনত হয়েছে কিংবা ঐসব জিহ্বাকে যেগুলো একনিষ্ঠভাবে তোমার একত্ব ঘোষণা করেছে এবং সব সময় তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছে অথবা ঐ সব হৃদয়কে দগ্ধ করবে যেগুলো তোমার প্রতি পূর্ণ অনুগত হওয়া পর্যন্ত জ্ঞান আহরণ করেছে কিংবা ঐসব হাত-পা প্রজ্বলিত করবে যেগুলো তোমার ইবাদতের স্থানগুলোয় স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তোমার ক্ষমা ভিক্ষার কঠোর প্রয়াস চালিয়েছে? এ তোমার কাছ থেকে কিছুতেই আশা করা যায় না। কেননা, তোমার দয়ার্দ্র্য স্বভাবের সাথে এরূপ আচরণ একেবারেই বেমানান, হে করুণাময়!
যদিও কুরআন আল্লাহ্ তায়ালাকে ‘শাস্তি দানে কঠোর’ (২:১৬৫) হিসাবে ঘোষণা করেছে, তবুও অন্যান্য স্থানে আল্লাহ্ তায়ালাকে ‘ক্ষমাশীল ও দয়াময়’ বলে বর্ণনা করেছে। একটি হাদীস অনুসারে আল্লাহ্ সম্পর্কে আমাদের ‘হুসনি যান’ অর্থাৎ একটি কল্যাণময় ও অনুগ্রহশীল স্রষ্টার ধারণা থাকা উচিত।
يَا كَرِيمُ، يَا رَبِّ وَأَنْتَ تَعْلَمُ ضَعْفِي عَنْ قَلِيلٍ مِّن بَلآءِ الدُّنْيَا وَعُقُوبَاتِهَا، وَمَا يَجْرِي فِيهَا مِنَ الْمَكَارِهِ عَلَى أَهْلِهَا عَلَى أَنَّ ذَلِكَ بَلآءٌ وَّمَكْرُوهٌ قَلِيلٌ مَّكْثُهُ، يَسِيرٌ بَقَآؤُهُ، قَصِيرٌ مُّدَّتُهُ
হে প্রভু! তুমি জানো যে, এ দুনিয়ার সামান্য কষ্ট এবং পৃথিবীর অধিবাসীদের ওপর নিপতিত ক্ষুদ্র আযাব সহ্য করাও আমার জন্য কতো কষ্টকর, যদিও সে আযাব স্বল্পস্থায়ী, সামান্য ও দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যায়।
فَكَيْفَ احْتِمَاِلي لِبَلآءِ الآخِرَةِ وَجَلِيلِ وُقُوعِ الْمَكَارِهِ فِيهَا!
لِأَنَّهُ لا يَكُونُ إِلا عَنْ غَضَبِكَ وَانْتِقَامِكَ وَسَخَطِكَ وَهَذَا مَا لا تَقُومُ لَهُ السَّمَاوَاتُ وَالأَرْضُ
তবে আমি কেমন করে পরকালের কষ্ট আর সেখানকার শাস্তি সইব, যে শাস্তির মেয়াদ দীর্ঘ, যার স্থায়িত্ব বিরাট, যার কোন বিরাম নেই, যা তোমার ক্রোধ ও কঠোর ন্যায়বিচারের পরিণতি, যা আসমান ও জমিন সহ্য করতে অক্ষম?
يَا سَيِّدِي فَكَيْفَ بِي وَأَنَا عَبْدُكَ الضَّعِيفُ الذَّلِيلُ الْحَقِيرُ الْمِسْكِينُ الْمُسْتَكِينُ يَا إِلَهِي وَرَبِّي وَسَيِّدِي وَمَوْلايَ لِأَيِّ الأُمُورِ إِلَيْكَ أَشْكُو وَلِمَا مِنْهَا أَضِجُّ وَأَبْكِي لِأَلِيمِ الْعَذَابِ وَشِدَّتِهِ! مْ لِطُولِ الْبَلآءِ وَمُدَّتِهِ! فَلَئِن صَيَّرْتَنِي لِلْعُقُوبَاتِ مَعَ أَعْدَآئِكَ وَجَمَعْتَ بَيْنِي وَبَيْنَ أَهْلِ بَلآئِكَ122 َّقْتَ بَيْنِي وَبَيْنَ أَحِبَّائِكَ وَأَوْلِيَائِكَ بْنِي يَا إِلَهِي وَسَيِّدِي وَمَوْلايَ وَرَبِّي صَبَرْتُ عَلَى عَذَابِكَ، كَيْفَ أَصْبِرُ عَلَى فِرَاقِكَ
হে প্রভু! তবে আমার কি হবে, আমি তোমার দুর্বল, ক্ষুদ্র, হীন, নগণ্য ও ম্রীয়মান দাসানুদাস?
হে আমার উপাস্য! আমার মালিক! আমার প্রভু! আমার লালনকর্তা! কোন্ বিষয়ে আমি তোমার কাছে অভিযোগ জানাব, আর কোন্টা নিয়ে আমি অশ্রু ঝরাব, আর বিলাপ করব- শাস্তির যাতনা ও তার তীব্রতার জন্য নাকি শাস্তির মেয়াদের দীর্ঘতার জন্য? অতএব, যদি তুমি আমাকে তোমার শত্রুদের সাথে শাস্তি দিতে নিয়ে যাও এবং তোমার আযাব ভোগকারী লোকদের সাথে আমাকেও জড়ো করো, আর তোমার আওলীয়াদের কাছ থেকে আমাকে পৃথক করে নাও, তাহলে হয়তো হে প্রভু! হে মালিক! হে ইলাহ্! হে প্রতিপালক! আমি তোমার এ সমস্ত শাস্তি ধৈর্যের সাথে সয়ে নেবো। কিন্তু তোমার থেকে বিচ্ছিন্নতা আমি সহ্য করব কীভাবে?
وَهَبْنِي صَبَرْتُ عَلَى حَرِّ نَارِكَ، فَكَيْفَ أَصْبِرُ عَنِ النَّظَرِ إِلَى كَرَامَتِكَ أَمْ كَيْفَ أَسْكُنُ فِي النَّارِ وَرَجَائِي عَفْوُكَ
কিংবা ধরা যাক। আমি তোমার আগুনের প্রজ্বলন সহ্য করতে পারলাম, কিন্তু কেমন করে আমি তোমার ক্ষমা ও দয়ার বঞ্চনা সয়ে নেব? কেমন করে আমি আগুনের মাঝে বসবাস করব যখন তোমার ক্ষমার ওপর ভরসা করে আমি আশার ভেলা ভাসিয়েছি?
আল্লাহ্র দয়া ও ক্ষমা পাওয়ার জন্য একজন অনুতপ্ত পাপীর একমাত্র অস্ত্র হলো করুণ বিলাপ ও কান্নাকাটি করে ক্ষমা প্রার্থনা। কুরআন বলে, ‘তোমার প্রভুকে ডাকো গোপনে ও বিনয়াবনতভাবে।’ একটি নির্ভরযোগ্য হাদীসে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ্র কাছে ঐ অশ্রুই সবচেয়ে প্রিয় যা একজন তাওবাকারীর চোখ হতে ঝরে।’ এ ছাড়া এমন বহু ঘটনা আছে যেখানে আমরা দেখতে পাই যে, খুব বড় বড় পাপীও আল্লাহ্র ক্ষমা ও করুণা পেয়েছে অশ্রুপাতের অস্ত্র প্রয়োগে।
বিখ্যাত ইসলামী ধর্মতাত্ত্বিক শেখ বাহাই তাঁর কাশফুল গ্রন্থের পঞ্চম খণ্ডে বর্ণনা করেন যে, একদিন এক বহুল পরিচিত পাপী বসরার উপকণ্ঠে মৃত্যুবরণ করে। বিধবা স্ত্রী তার দাফন-কাফনের জন্য গ্রামবাসী বহু লোককে অনুরোধ জানালো, কিন্তু লোকটার কুখ্যাতির কারণে কেউই এ কাজে এগিয়ে এলো না। শেষ চেষ্টা হিসাবে বিধবাটি কয়েকজন ভাড়াটে কুলি দিয়ে লাশ মসজিদের বাইরে এনে রাখলো এ আশায় যে, হয়তো কোন মুসল্লী এর জানাজা ও দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করবে। কিন্তু মুসল্লীরা কেউ লাশের দিকে ফিরেও তাকালো না। তারপর মহিলাটি লাশকে কোন রকম গোসল বা কাফন ছাড়াই দাফন করার উদ্দেশে বনের দিকে রওয়ানা হলো। বনের মধ্যে পৌঁছে সে অবাক হয়ে দেখলো একজন বৃদ্ধ দরবেশ, যিনি একটা গুহায় বসে ইবাদত-বন্দেগীতে দিন কাটাতেন, তিনি এ লাশের জন্য অপেক্ষা করছেন। দরবেশ লাশটি গ্রহণ করলেন এবং একে গোসল দিয়ে কাফন পরিয়ে কাছের গ্রামে খবর পাঠালেন যে, তিনি ঐ লাশের জানাজা পড়তে যাচ্ছেন। পাশের গ্রাম ও বসরা শহরেরও কিছু লোক ঐ সংবাদে সেখানে জড়ো হলো এবং অবাক হয়ে জানতে চাইলো যে, তাঁর মতো একজন সম্মানিত দরবেশ কী করে তাঁর ইবাদত-বন্দেগীর স্থান ছেড়ে কুখ্যাত এ লোকের জানাজা পড়াতে হাজির হয়েছেন। জবাবে তিনি বললেন যে, এক গায়েবী আওয়াজের মাধ্যমে তাঁকে এ লাশের জানাজা পড়াতে বলা হয়েছে। গায়েবী আওয়াজে এ লাশকে উল্লেখ করা হয়েছে, এমন এক তওবাকারী লোক হিসাবে যাকে আল্লাহ্ তায়ালা ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং তাঁর রহমতের নৈকট্য দান করেছেন। বিস্ময়াভিভূত জনতা তখন সেই বিধবার কাছে জানতে চাইলো আল্লাহ্র বিশেষ রহমত পাবার মতো কোন সৎ কাজ বা সদগুণ সেই লোকটির ছিল কিনা। বিধবা বললো যে, তার জানা মতে তার স্বামী যদিও মাদকাসক্তিসহ নানা পাপাচারে অভ্যস্ত ছিলো, কিন্তু তার তিনটি অদ্ভুদ গুণ ছিল। প্রথমত ভোরবেলা যখন তার ঘুম ভাঙতো সে সম্পূর্ণ গোসল করে, পবিত্র কাপড় পরিধান করে ফজরের নামাজ আদায় করতো। দ্বিতীয়ত এমন একটা দিনও যেতো না যেদিন সে এতিমদের প্রতি কোন না কোন দয়া-দাক্ষিণ্য না করতো। তার অভ্যাস ছিল, প্রতি বেলার খাবার সময় দুই-তিনজন এতিমসহ দস্তরখানে বসা। সে তার নিজের সন্তানদের চেয়েও এতিমদের বেশি স্নেহ করতো। তৃতীয়ত কখনো মাঝরাতে ঘুম ভাঙলে সে কাঁদতে কাঁদতে দোয়া করে বলতো, ‘হে আমার প্রভু! তুমি কি দয়া করে আমার দেহকে সমস্ত দোজখের সমান বিস্তৃত করে দেবে, যাতে সেখানে আর কারো স্থান না হয়? হে মালিক! আমি স্থির থাকতে পারবো না।’ বিধবার এসব কথা শুনে সেই দরবেশসহ সমস্ত জনতার চোখে অশ্রু নামলো এবং সবাই এক বাক্যে স্বীকার করলো, ‘এতিমদের এমন সাহায্যকারী আর এত কোমল হৃদয়ের অধিকারী এক ব্যক্তির জানাজায় শরীক হতে পেরে আমরা সত্যি ভাগ্যবান!’ তারপর তারা সবাই মিলে জানাযায় শরীক হলো এবং বিশেষ যত্ন ও মর্যাদার সাথে তার দাফন করলো।
১। শেখ বাহাই এবং বাহাই ধর্মের বাহাউল্লাহ এক ব্যক্তি নন। রিডার্স ডাইজেস্ট গ্রেট এনসাইক্লোপেডিক ডিকশনারী অনুসারে ‘বাব’ নামে এক ব্যক্তি উনিশ শতকে বাহাই ধর্মের প্রবর্তন করেন। অল্পদিন পরেই ‘বাহাউল্লাহ’ নামের এক ব্যক্তি এ ধর্মের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং ওহী প্রাপ্তির দাবী করেন।
فَبِعِزَّتِكَ يَا سَيِّدِي وَمَوْلايَ أُقْسِمُ صَادِقًا، لَئِنْ تَرَكْتَنِي نَاطِق
হে আমার প্রভু! তোমার মহামর্যাদার শপথ, তুমি যদি দোজখের আগুনের মধ্যেও আমার বাকশক্তি রক্ষা কর, তাহলে আমি সেখানে বসে একজন দৃঢ় আশাবাদীর আশা নিয়েই তোমার কাছে কাতর আকুতি জানাতে থাকবো।
لَأَضِجَّنَّ إِلَيْكَ بَيْنَ أَهْلِهَا ضَجِيجَ الآمِلِينَ وَلأَصْرُخَنَّ إِلَيكَ صُرَاخَ المُسْتَصْرِخِينَ وَلَأَبْكِيَنَّ عَلَيْكَ بُكَاءَ الفَاقِدِينَ وَلَأُنَادِيَنَّكَ أَيْنَ كُنْتَ يَا وَلِيَّ الْمُؤْمِنِينَ يَا غَايَةَ آمَاِل العَارِفِينَ يَا غِيَاثَ المُسْتَغِيْثِينَ يَا حَبِيبَ قُلُوبِ الصَّادِقِينَ وَيَا إِلَهَ العَالَمِينَ
আমি তোমার কাছে একজন সহায়হীনের মতোই সাহায্য প্রার্থনা করব, একজন নিঃস্বের মতোই আমি তোমার কাছে আকুল হয়ে কাঁদব, আর তোমাকে ডাক ছেড়ে বলব, হে মুমিনদের সহায়! হে ঈমানদারদের একমাত্র ভরসা! হে সাহায্য প্রার্থীদের বন্ধু! হে জগতের সমস্ত অধিবাসীর প্রভু! কোথায় তুমি?
মর্মস্পর্শী এসব কথা উচ্চারিত হচ্ছে একজন মুমিনের কণ্ঠ হতে, সে যদিও তার দোযখপ্রাপ্তির বিষয়ে আল্লাহ্র ন্যায় সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানাচ্ছে না, তবুও সে আল্লাহ্র দয়া ও নৈকট্য থেকে বঞ্চিত হওয়ার বিষয়কে মেনেও নিতে পারছে না। আল্লাহ্র সাথে এ ভাষায় প্রার্থনা কেবল একজন নিষ্পাপ ইমামের মুখ থেকেই উচ্চারিত হতে পারে, যিনি জানেন কোন্ ভাষায় আল্লাহ্র কাছে আবেদন জানাতে হয়। একই ধরনের বাক্য দেখা যায় আবু হামজা সুমালীকে রমজান মাসের প্রতিটি ভোরে পড়ার জন্য শেখানো ইমাম যয়নুল আবেদীন (আঃ)-এর দোয়ায়। ঐ দোয়ার এক অনুচ্ছেদে বলা হচ্ছে, ‘হে আমার প্রভু! তুমি যদি আমাকে আগুনে নিক্ষিপ্ত করো, সেটা কেবল তোমার শত্রুদেরই আনন্দিত করবে, কিন্তু তুমি যদি আমাকে বেহেশতে প্রবেশ করাও তাহলে সেটা তোমার নবীকে আনন্দিত করবে। হে আল্লাহ্! আমি জানি, তোমার শত্রুপক্ষের আনন্দের চেয়ে তোমার নবীর আনন্দই তোমার কাছে প্রিয়তর।’ দোয়ার আরেকটি অনুচ্ছেদে বলা হচ্ছে, ‘ইয়া মালিক! ইয়া রব্ব! তোমার মর্যাদা ও সম্মানের নামে শপথ করে বলছি, তুমি যদি আমার পাপের প্রতিদান দিতে চাও তবে আমি তোমার ক্ষমা প্রার্থনা করব, তুমি যদি আমার দোষগুলোর জন্য শাস্তি দিতে চাও তবে আমি তোমার অনুকম্পা প্রার্থনা করব, যদি আমাকে তুমি দোযখে নিক্ষেপ করো তবে আমি দোযখের অধিবাসীদের কাছে তোমার প্রতি আমার মমত্বের কথা জানাব’।
أَفَتُرَاكَ، سُبْحَانَكَ يَا إِلَهِي وَبِحَمْدِكَ، تَسْمَعُ فِيهَا صَوْتَ عَبْدٍ مُّسْلِمٍ سُجِنَ فِيهَا بِمُخَالَفَتِهِ وَذَاقَ طَعْمَ عَذَابِهَا بِمَعْصِيَتِهِ وَحُبِسَ بَيْنَ أَطْبَاقِهَا بِجُرْمِهِ وَجَرِيرَتِهِ وَهُوَ يَضِجُّ إلَيْكَ ضَجِيجَ مُؤَمِّلٍ لِّرَحْمَتِكَوَيُنَادِيكَ بِلِسَانِ أَهْلِ تَوْحِيدِكَ وَيَتَوَسَّلُ إلَيْكَ بِرُبُوبِيَّتِكَ
হে খোদা! সমস্ত প্রশংসা আর মর্যাদা তোমারই, তুমি কি একবারও ফিরে দেখবে না যে, একজন মুসলমান দাস তার অবাধ্যতার কারণে দোযখের আগুনে বন্দী এবং অন্যায় আচরণের কারণে এর শাস্তি ভোগ করেও তোমার দয়ার ওপর দৃঢ় আস্থা নিয়ে তোমার প্রতি তীব্র আবেদন জানাচ্ছে এমন সব ব্যক্তির মতো যারা তোমার তাওহীদে দৃঢ় বিশ্বাসী এবং তোমার প্রভুত্বের কাছে আভূমি নতজানু?
এ অনুচ্ছেদে অত্যন্ত বিনয়াবনত চিত্তে এক অপরাধপ্রবণ সৃষ্টি স্রষ্টার কাছে একটি ক্ষুদ্র যুক্তি তুলে ধরছে তাঁর করুণা আকর্ষণের লক্ষ্যে।
يَا مَوْلايَ فَكَيْفَ يَبْقَى فِي الْعَذَابِ وَهُوَ يَرْجُو مَا سَلَفَ مِنْ حِلْمِكَ
ইয়া মাওলা! তোমার অতীত ক্ষমা, অনুকম্পা ও রহমতের ওপর পূর্ণ ভরসা রাখার পরও কেমন করে সেই বান্দা কঠিন আযাবের মাঝে নিমজ্জিত থাকবে?
প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্ নিজেই তাঁর এসব গুণের কথা পবিত্র কুরআনে বলেছেন, ‘ঘোষণা করে দাও (হে মুহাম্মাদ) আমার বান্দাদের কাছে যে, নিশ্চয়ই আমি ক্ষমাশীল, দয়ার্দ্র্য।’ (সূরা ১৫, আয়াত ৪৯) ‘তোমার প্রভু নিজের জন্য নির্ধারিত করেছেন দয়ার্দ্র্য আচরণ।’ (আল কুরআন)
أَمْ كَيْفَ تُؤْلِمُهُ النَّارُ وَهُوَ يَأْمَلُ فَضْلَكَ وَرَحْمَتَكَ أَمْ كَيْفَ يُحْرِقُهُ لَهِيبُهَا وَأَنتَ تَسْمَعُ صَوْتَهُ وَتَرَى مَكَانَهُ أَمْ كَيْفَ يَشْتَمِلُ عَلَيْهِ زَفِيرُهَا وَأَنْتَ تَعْلَمُ ضَعْفَهُ أَمْ كَيْفَ يَتَقَلْقَلُ بَيْنَ أَطْبَاقِهَا وَأَنْتَ تَعْلَمُ صِدْقَهُ أَمْ كَيْفَ تَزْجُرُهُ زَبَانِيَتُهَا وَهُوَ يُنَادِيكَ يَا رَبَّهُ
أَمْ كَيْفَ يَرْجُو فَضْلَكَ فِي عِتْقِهِ مِنْهَا فَتَتْرُكُهُ فِيهَا
هَيهَاتَ مَا ذَلِكَ الظَّنُّ بِكَ وَلا الْمَعْرُوفُ مِنْ فَضْلِكَ وَلا مُشْبِهٌ لِمَا عَامَلْتَ بِهِ الْمُوَحِّدِينَ مِنْ بِرِّكَ وَإِحْسَانِكَ فَبِالْيَقِينِ أَقْطَعُ لَوْلا مَا حَكَمْتَ بِهِ مِن تَعْذِيبِ جَاحِدِيكَ وَقَضَيْتَ بِهِ مِنْ إِخْلاَدِ مُعَانِدِيكَ لَجَعَلْتَ النَّارَ كُلَّهَا بَرْدًا وَّسَلاَمًا، وَمَا كَانَ لأَحَدٍ فِيهَا مَقَرًّا وَّلا مُقَامًا لَّكِنَّكَ تَقَدَّسَتْ أَسْمَاؤُكَ أَقْسَمْتَ أَنْ تَمْلَأَهَا مِنَ الْكَافِرِينَ، مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ وَأَنْ تُخَلِّدَ فِيهَا الْمُعَانِدِينَ وَأَنْتَ جَلَّ ثَنَاؤُكَ قُلْتَ مُبْتَدِئًا، وَّتَطَوَّلْتَ بِالإِنْعَامِ مُتَكَرِّمًا: أَفَمَنْ كَانَ مُؤْمِنًا كَمَنْ كَانَ فَاسِقًا لَّا يَسْتَوُونَ
إِلَهِي وَسَيِّدِي فَأَسْألُكَ بِالْقُدْرَةِ الَّتِي قَدَّرْتَهَا وَبِالْقَضِيَّةِ الَّتِي حَتَمْتَهَا وَحَكَمْتَهَا وَغَلَبْتَ مَنْ عَلَيْهِ أَجْرَيْتَهَا أَن تَهَبَ لِي، فِي هذِهِ اللَّيْلَةِ، وَفِي هَذِهِ السَّاعَةِ كُلَّ جُرْمٍ أَجْرَمْتُهُ وَكُلَّ ذَنْبٍ أَذْنَبْتُهُ وَكُلَّ قَبِيحٍ أَسْرَرْتُهُ وَكُلَّ جَهْلٍ عَمِلْتُهُ، كَتَمْتُهُ أَوْ أَعْلَنتُهُ، أَخفَيْتُهُ أَوْ أَظْهَرْتُهُ وَكُلَّ سَيِّئَةٍ أَمَرْتَ بِإِثْبَاتِهَا الْكِرَامَ الكَاتِبِينَ الَّذِينَ وَكَّلْتَهُم بِحِفْظِ مَا يَكُونُ مِنِّي، وَجَعَلْتَهُمْ شُهُودًا عَلَيَّ مَعَ جَوَارِحِي، وَكُنتَ أَنْتَ الرَّقِيبَ عَلَيَّ مِن وَّرَائِهِمْ، وَالشَّاهِدَ لِمَا خَفِيَ عَنْهُمْ، وَبِرَحْمَتِكَ أَخْفَيْتَهُ، وَبِفَضْلِكَ سَتَرْتَهُ وَأَنْ تُوَفِّرَ حَظِّي مِن كُلِّ خَيْرٍ تُنْزِلُهُ، أَوْ إِحْسَانٍ تُفْضِلُهُ أَوْ بِرٍّ تَنْشُرُهُ، أَوْ رِزْقٍ تَبْسُطُهُ أَوْ ذَنْبٍ تَغْفِرُهُ أَوْ خَطَأٍ تَسْتُرُهُ يَا رَبِّ يَا رَبِّ يَا رَبِّ يَا إِلَهِي وَسَيِّدِي وَمَوْلايَ وَمَاِلكَ رِقِّي يَا مَنْ بِيَدِهِ نَاصِيَتِي يَا عَلِيمًا بِضُرِّي وَمَسْكَنَتِي يَا خَبِيرًا بِفَقْرِي وَفَاقَتِي يَا رَبِّ يَا رَبِّ يَا رَبِّ أَسْأَلُكَ بِحَقِّكَ وَقُدْسِكَ وَأَعْظَمِ صِفَاتِكَ وَأَسْمَائِكَ أنْ تَجْعَلَ أَوْقَاتِي فِى اللَّيلِ وَالنَّهَارِ بِذِكْرِكَ مَعْمُورَةً، وَبِخِدْمَتِكَ مَوْصُولَةً، وَّأَعْمَاِلي عِنْدَكَ مَقْبُولَةً، حَتَّى تَكُونَ أَعْمَاِلي وَأَوْرَادِي كُلُّهَا وِرْدًا وَّاحِدًا، وَّحَاِلي فِي خِدْمَتِكَ سَرْمَدًا
জানো সে কি ভীষণ দুর্বল? কিংবা কেমন করে সে দোযখের স্তরগুলোর চাপে নিষ্পিষ্ট হতে থাকবে যখন তুমি তার নিষ্ঠার কথা জানো? কিংবা কেমন করে দোযখের প্রহরীরা তাকে কষ্ট দেবে যখন সে কেবলই ডাকছে ‘ইয়া রব্ব!’ বলে?
কেমন করে তুমি তাকে ফেলে রাখবে (দোযখের মাঝে) যখন তার দৃঢ় বিশ্বাস যে, তোমার অপার করুণা তাকে এখান থেকে মুক্ত করবে? হায়! এমনটা তোমার থেকে আমরা আশা করি না, তোমার করুণার চোহারাও এমনটা নয়, কিংবা তোমার একত্বে বিশ্বাসীদের প্রতি তুমি যে করুণা প্রদর্শন করো, তার সাথেও এর কোন মিল নেই।
অতএব, আমি নিশ্চিত হয়ে ঘোষণা করছি যে, যদি তুমি অবিশ্বাসীদের জন্য শাস্তি নির্ধারণ না করতে এবং তোমার শত্রুদের আবাস হিসাবে দোযখকে নির্ধারিত না করতে, তাহলে তুমি দোযখকে শীতল ও প্রশান্তিময় করে তুলতে এবং কোন মানুষকেই কষ্টকর দোযখবাস করতে হতো না; কিন্তু পবিত্র তোমার নাম, তুমি শপথ করেছ যে, তুমি জ্বিন ও মানুষের মধ্যে যারা অবিশ্বাসী তাদের দিয়ে দোযখ পূর্ণ করবে এবং একে তোমার কঠোর বিরুদ্ধবাদীদের চিরস্থায়ী নিবাসে পরিণত করবে।
আর মহিমান্বিত তোমার গুণাবলী, তোমার অপার অনুগ্রহে তুমি ঘোষণা করেছ, ‘একজন মুমিন আর একজন ফাসেক কি সমান? তারা সমান হতে পারে না।’ (আল কুরআন, ৩২-১৮)
হে মহাপ্রভু! তোমার কাছে আমি প্রার্থনা করছি তোমার অবিসংবাদিত কর্তৃত্ব ও সিদ্ধান্তের নামে যা তুমিই চূড়ান্ত ও কার্যকর করে থাকো এবং যা দ্বারা তুমি তাকে কর্তৃত্বাধীন রাখো যার ওপর সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়; দয়া করে আমাকে এ রাতের এ প্রহরে ক্ষমা করে দাও সেই সমস্ত সীমালঙ্ঘনের জন্য যেগুলোর অপরাধে আমি অপরাধী, সেই সমস্ত ঘৃণ্য কাজের জন্য যা আমি গোপন রেখেছি, সেই সমস্ত প্রকাশ্য বা অপ্রকাশ্য অপকর্মের জন্য যা আমি করেছি- অন্ধকারে কিংবা দিবালোকে এবং সেই সকল মন্দ কাজের জন্য যা লিপিবদ্ধ হয়েছে সম্মানিত লিপিকারদের দ্বারা যাদের তুমি আদেশ করেছো আমার সমস্ত ক্রিয়া-কর্ম লিপিবদ্ধ করতে এবং শরীরের বিভিন্ন অংগ-প্রত্যংগের মতো আমার কার্যকলাপের সাক্ষী হতে আর তুমি নিজেই তো মহাপর্যবেক্ষক এবং তোমার অশেষ করুণায় তুমি যেসব মন্দ কর্ম তাদের কাছে গোপন রাখো তার সবই তো তোমার কাছে পরিষ্কার।
তোমার কাছ আরো প্রার্থনা করি, তোমার নাযিলকৃত প্রতিটি কল্যাণ, প্রতিটি দাক্ষিণ্য, প্রতিটি বরকত, প্রতিটি রিজিক বৃদ্ধি, পাপের ক্ষমা ও ত্রুটি গোপনের মতো প্রতিটি রহমত বর্ষণ হতে আমাকে একটি বিরাট অংশ দান করো। ইয়া রব্ব! ইয়া রব্ব! ইয়া রব্ব! হে উপাস্য প্রভু! হে মনিব! হে মাওলা ও হে আমার আজাদীর মালিক যিনি আমার ভাগ্য নিয়ন্তা ও আমার যাতনা ও নিঃস্বতা সম্পর্কে পরিজ্ঞাত, যিনি আমার দুঃস্থতা ও অনাহার সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন। ইয়া রব্ব! ইয়া রব্ব! ইয়া রব্ব! তোমার মহামর্যাদা, প্রবল প্রতাপ ও পরিপূর্ণরূপ নিখুঁত গুণাবলীর নামে এবং তোমার নামসমূহের উসিলায় আমি তোমার কাছে মিনতি করি, আমার সমস্ত প্রহর, দিবা ও রাত্রি যেন তোমার খেদমত ও যিকিরে অতিবাহিত হয় এবং আমার আচরণ এমনভাবে তোমার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোল যেন আমার সমস্ত নামাজ, উপাসনা ও কর্ম সম্পাদন পরস্পর মিলিত হয়ে একই ইবাদতের ধারায় প্রবাহিত হয় এবং আমার সমগ্র জীবন যেন ব্যয়িত হয় তোমার অবিরাম, অবিরল খেদমত সাধনায়।
আল কুরআন বলে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ্র স্মরণেই হৃদয়সমূহ প্রশান্তি লাভ করে।’ (সূরা ১৩, আয়াত ২৮) যারা বিচ্ছেদ, দুঃস্থতা, দারিদ্র্য, পাপাচার ও নানা ধরনের কষ্টে জর্জরিত, আল্লাহ্র স্মরণ তাদের প্রশান্তি দেয়। আল্লাহ্র খেদমতের সংজ্ঞায় পরিবার ও মানবতার খেদমতও অন্তর্ভুক্ত। ‘নামাজ পড়া’-কে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কেননা, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় ছাড়া আল্লাহ্র যিকির (স্মরণ) সম্ভব নয়। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, ‘সুতরাং তোমরা আমাকেই স্মরণ করো, আমি তোমাদের স্মরণ করবো।’ (সূরা ২, আয়াত ১৫২) হযরত আলী (রা.)-এর একটি হাদীসে বলা হয়েছে, ‘যখন নামাজের সময় হয়, একজন ফেরেশতা মানুষকে ডেকে বলতে থাকে-উঠে দাঁড়াও এবং তোমাদের পেছনে যে অগ্নি তোমরা প্রজ্বলিত করছো সেটা তোমাদের মুখ দিয়ে (নামাজের মাধ্যমে) নিভিয়ে ফেলো।’
يَا سَيِّدِي، يَا مَنْ عَلَيْهِ مُعَوَّلِي يَا مَنْ إلَيْهِ شَكَوْتُ أَحْوَاِلي يَا رَبِّ يَا رَبِّ يَا رَبِّ
قَوِّ عَلَى خِدْمَتِكَ جَوَارِحِي وَاشْدُدْ عَلىَ الْعَزِيمَةِ جَوَانِحِي وَهَبْ لِيَ الْجِدَّ فِي خَشْيَتِكَ وَالدَّوَامَ فِي الإِتِّصَاِل بِخِدْمَتِكَ
হে আমার প্রভু! যার ওপর আমার সমস্ত ভরসা, যার কাছে আমি আমার সমস্ত দুর্দশার কথা খুলে বলি! ইয়া রব্ব! ইয়া রব্ব! ইয়া রব্ব! তোমার খেদমতের জন্য আমার দেহকে শক্তিশালী করে তোলো এবং আমার বাহুর শক্তি অক্ষুণ্ন রাখো; আর আমার মধ্যে প্রদান করো খোদাভীতি ও সর্বক্ষণ তোমার খেদমতের তীব্র আকাঙ্ক্ষা।
খোদাভীতিই হচ্ছে বিশৃঙ্খলা, অপরাধ ও নীতিহীনতার বিরুদ্ধে একমাত্র রক্ষাকবচ। মানব রচিত আইনের শাস্তির বিধানসসমূহ এগুলো প্রতিরোধে অসর্মথ। আল্লাহ্র ভয় উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন আল্লাহ্, তাঁর ক্ষমতা ও শাস্তিসমূহ সম্পর্কে মানুষের মনে সচেতনতা সৃষ্টি। “আল্লাহ্র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই আল্লাহ্কে ভয় করে।’
মানুষকে তাদের অপকর্মের ভয়ঙ্কর পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়ার উদ্দেশ্যে আল্লাহ্ তায়ালা মাঝে মাঝে ভূমিকম্প, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদির মতো কিছু প্রতীকী শাস্তির ব্যবস্থা করেন। অত্যাধুনিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঠেকানোর কোন ক্ষমতা দুনিয়ার কারো নেই। এসব প্রতীকী সতর্কবাণী সত্ত্বেও দুনিয়ার মানুষ এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ তো দূরের কথা, উল্টো মানব রচিত আইন ও সমকামিতার মতো জঘন্য অপকর্মকেও বৈধ করে নিয়েছে। মানুষ নীতিহীনতার নাম দিয়েছে ‘পারমিসিভনেস’; আর কন্যা, জায়া ও মাতৃ জাতির পবিত্রতম সম্পদ সতীত্বকে সস্তা পণ্যে পরিণত করার নাম দিয়েছে ‘নারী স্বাধীনতা’; এমনকি তারা আল্লাহ্র অন্যতম প্রিয় বান্দা নবী ঈসাকে চিত্রিত করেছে একজন সমকামী হিসাবে। এমন সব ক্রিয়াকলাপ করার পর আমরা কিছুতেই পরকালের ধ্বংস হতে নিজেদের মুক্ত করার জন্য স্রষ্টার পূত-পবিত্র চরিত্র, খ্রিস্টানদের মতো কেবল “স্তুতিগীত” নয়।
حَتَّى أَسْرَحَ إِلَيكَ فِي مَيَادِينِ السَّابِقِينَ وَأُسْرِعَ إلَيْكَ فِي الْمبُادِرِينَ وَأَشْتَاقَ إلىَ قُرْبِكَ فِي الْمُشْتَاقِينَ وَأَدْنُوَ مِنْكَ دُنُوَّ الْمُخْلِصِينَ وَأَخَافَكَ مَخَافَةَ الْمُوقِنِينَ وَأَجْتَمِعَ فِي جِوَارِكَ مَعَ الْمُؤْمنِينَ اَللَّهُمَّ وَمَنْ أَرَادَنِي بِسُوٍء فَأَرِدْهُ وَمَنْ كَادَنِي فَكِدْهُ وَاجْعَلْنِي مِنْ أَحْسَنِ عَبِيدِكَ نَصِيبًا عِنْدَكَ وَأَقْرَبِهِم مَّنْزِلَةً مِّنْكَ وَأَخَصِّهِمْ زُلْفَةً لَّدَيْكَ فَإِنَّهُ لا يُنَالُ ذَلِكَ إِلاّ بِفَضْلِكَ وَجُدْ لِي بِجُودِكَ وَاعْطِفْ عَلَيَّ بِمَجْدِكَ وَاحْفَظْنِي بِرَحْمَتِكَ وَاجْعَل لِّسَانِي بِذِكْرِكَ لَهِجًا وَقَلْبِي بِحُبِّكَ مُتَيَّمًا وَّمُنَّ عَلَيَّ بِحُسْنِ إِجَابَتِكَ وَأَقِلْنِي عَثْرَتِي وَاغْفِرْ زَلَّتِي فَإِنَّكَ قَضَيْتَ عَلَى عِبَادِكَ بِعِبَادَتِكَ وَأَمَرْتَهُم بِدُعَائِكَ وَضَمِنْتَ لَهُمُ الإِجَابَةَ
যেন আমি সহজেই যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্রগামীদের শামিল হয়ে তোমার পানে অগ্রসর হতে পারি এবং যারা তোমার দিকে তীব্র বেগে ধাবমান তাদের মধ্যে দ্রুততর হতে পারি, আর যারা একাগ্র নিষ্ঠায় তোমার নৈকট্য লাভ করেছে, তাদের মতোই যেন আমি নিজেকে তোমার নৈকট্য লাভের সাধনায় নিয়োজিত করতে পারি এবং নিশ্চিত বিশ্বাস (ইয়াকীন) সম্পন্নদের মতোই যেন তোমাকে ভয় করে চলি এবং এভাবে যেন আমি তোমার নৈকট্যপ্রাপ্ত মুমিনদের মিছিলের একজন হয়ে যেতে পারি। হে আল্লাহ্! যে আমার অনিষ্ট চায় তুমি তারই অনিষ্ট করো! আর যে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে তাকেই ষড়যন্ত্রের শিকারে পরিণত করো এবং আমাকে তোমার শ্রেষ্ঠ দাসদের সঙ্গে এমন এক স্থান দান করো, যা তোমার অধিকতর নিকটে, নিশ্চয়ই ঐ স্থান তোমার অনুগ্রহ ছাড়া অর্জন সম্ভব নয়। তোমার মহকর্তৃত্বের বাহু আমার দিকে প্রসারিত করো এবং আমাকে রক্ষা করো তোমার অপার করুণায়! আমার জিহ্বা যেন সর্বক্ষণ নিয়োজিত থাকে তোমার স্মরণে এবং হৃদয় যেন প্রেমার্ত থাকে তোমার মুগ্ধতায়! করুণা করো আমার প্রতি একটি দয়ার্দ্র্য প্রত্যুত্তর দিয়ে, আমার পদস্খলনগুলো মুছে দাও এবং আমার ত্রুটিগুলো মার্জনা করে দাও! কেননা তুমিই তোমার বান্দাদের জন্য নির্ধারণ করেছো আনুগত্য, আদেশ করেছো প্রার্থনা জানাতে এবং নিশ্চয়তা দিয়েছো এ সবের জবাব দানের।
উপরিউক্ত অনুচ্ছেদে যে নিশ্চয়তা দানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তা বলা হয়েছে কুরআনের ৪০ নম্বর সূরার ৬০ নম্বর আয়াতে, ‘এবং তোমার প্রভু বলেছেন, আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেবো।’ তবে, দোয়ার জবাব পাওয়ার জন্য কয়েকটি শর্তের কথা বলা হয়েছে। কুরআনে সূরা বাকারার ১৮৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আমাকে আহ্বানকারী প্রত্যেক ব্যক্তির দোয়ারই আমি জবাব দেই। সুতরাং তারাও আমার আহ্বানে সাড়া দিক এবং আমার ওপর ঈমান আনুক যাতে তারা সৎ পথে পরিচালিত হতে পারে।’ ‘আমার ওপর ঈমান’ অর্থ হচ্ছে তাঁর সজাগ উপস্থিতি এবং আমাদের ওপর তাঁর সর্বময় কর্তৃত্বের সুস্পষ্ট উপলদ্ধি। ‘আল্লাহ্র ডাকে সাড়া দেয়া’ অর্থ তাঁর আদেশ নিষেধসমূহের প্রতি আনুগত্য। তিনি বলেন, ‘তোমরা আমার প্রতি তোমাদের অঙ্গীকার পূর্ণ করো, আমিও তোমাদের সাথে আমার অঙ্গীকার রক্ষা করবো।” (সূরা ২, আয়াত : ৪০)
فَإِلَيْكَ يَا رَبِّ نَصَبْتُ وَجْهِي وَإلَيْكَ يَا رَبِّ مَدَدْتُ يَدِي فَبِعِزَّتِكَ اسْتَجِبْ لِي دُعَائِي وَبَلِّغْنِي مُنَايَ وَلا تَقْطَعْ مِن فَضْلِكَ رَجَائِي وَاكْفِنِي شَرَّ الْجِنِّ وَالإِنْسِ مِنْ أَعْدَائِي يَا سَرِيعَ الرِّضَا اِغْفِرْ لِمَن لا يَمْلِكُ إِلا الدُّعَاءَ فَإِنَّكَ فَعَّالٌ لِّمَا تَشَاءُ يَا مَنْ اسْمُهُ دَوَاءٌ وَذِكْرُهُ شِفَاءٌ وَطَاعَتُهُ غِنًى ارْحَم مَّن رَّأْسُ مَاِلهِ الرَّجَاءُ وَسِلاَحُهُ الْبُكَاءُ يَا سَاِبغَ النِّعَمِ يَا دَافِعَ النِّقَمِ يَا نُورَ الْمُسْتَوْحِشِينَ فِي الظُّلَمِ يَا عَالِمًا لا يُعَلَّمُ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَّآلِ مُحَمَّدٍ وافْعَلْ بِي مَا أَنتَ أَهْلُهُ
তাই তোমার পানেই হে প্রভু, আমি মুখ ফিরিয়েছি এবং তোমার কাছেই আমি হাত উঠিয়েছি, অতএব, তোমার মহামর্যাদার উসিলায় আমার দোয়া কবুল করো এবং আমার আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করো। কিছুতেই আমাকে হতাশ করো না এবং তুমি আমায় রক্ষা করো জ্বীন ও মানুষের মধ্যে যারা আমার শত্রু তাদের অনিষ্ট হতে।
হে প্রভু! যে তুমি দ্রুত সন্তুষ্ট হও। তাকে তুমি ক্ষমা করো দোয়া ছাড়া যার অন্য কোন সম্বল নেই। কেননা, তোমার যা ইচ্ছা তুমিতো তা-ই করতে পারো। হে প্রভু! যার নামে দুর্গতির মুক্তি, যার স্মরণেই সমস্ত কষ্টের প্রতিকার এবং যার আনুগত্যই সম্পদ। রহম করো তার ওপর, যার মূলধন শুধু আশা আর শুধু কান্না।
হে সমস্ত নেয়ামতের পূর্ণতা দানকারী ও সমস্ত দুর্যোগের ত্রাণকর্তা! হে অন্ধকারে পথভ্রান্ত একাকীদের দিশা! হে সর্বজ্ঞ! যাকে কখনো শেখানো হয়নি! মুহাম্মদ ও তাঁর বংশধরদের ওপর শান্তি বর্ষণ করো এবং আমার প্রতি তা-ই করো যা করা তোমাকে মানায়।
প্রার্থনাকারী এখানে পূর্ণ বিনয়ের সাথে আকুতি জানাচ্ছে, তাকে যেন একজন পাপী হিসাবে তার যা প্রাপ্য তা দেয়া না হয়, বরং ক্ষমাশীল ও দয়ালু মহাপ্রভু হিসাবে আল্লাহ্ তায়ালার কাছ থেকে যে দয়ার্দ্র্য আচরণ ও দান প্রার্থনায় +আকাঙ্ক্ষিত তা-ই যেন করা হয়। আর তাকে যেন সত্য ও সুন্দর পথে পরিচালনা করা হয়। কেননা, খোদাতায়ালাই সরল ও সত্য পথের পরিচালক।
وَصَلَّى اللَّهُ عَلَى رَسُولِهِ وَالأَئِمَّةِ الْمَيَامِينَ مِنْ آلِهِ وَسَلَّمَ تَسْلِيمًا كَثِيرًا
শান্তি বর্ষিত হোক তাঁর রাসূলের ওপর এবং তাঁর বংশধরদের মধ্য হতে পবিত্র ইমামদের ওপর এবং তাদের দান করো অপার ও অসীম প্রশান্তি।
সমাপ্ত